সিলেট জেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম জকিগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়। যুগের পর যুগ ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি অত্র অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এস.এস.সি পরীক্ষার ফলাফলে এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টি তার কাঙ্ক্ষিত মান ধরে রাখতে পারছে না এবং আশানুরূপ ফলাফল অর্জনে বেশ খানিকটা পিছিয়ে পড়ছে।
একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এমন ফলাফল আমাদের শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকার সুধীজনদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। এই পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সঠিক পদক্ষেপ না নিলে আমাদের আগামী প্রজন্ম এক বড় ধরণের শিক্ষাগত ক্ষতির মুখে পড়বে।
ফলাফলে পিছিয়ে পড়ার মূল কারণসমূহ
১. শিক্ষক সংকট ও শূন্যপদ:
বিদ্যালয়টিতে অনেক দিন ধরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞ শিক্ষক না থাকা পড়ালেখার মানে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। শিক্ষক স্বল্পতার কারণে নিয়মিত ক্লাস ও শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মনিটরিং ব্যাহত হচ্ছে।
২. অভিভাবকদের অসচেতনতা ও তদারকির অভাব:
অনেক অভিভাবক মনে করেন সন্তানকে শুধু একটি স্বনামধন্য সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিলেই তাদের দায়িত্ব শেষ। বাসায় নিয়মিত পড়ালেখা হচ্ছে কি না, সন্তান কার সাথে মিশছে বা ক্লাসে তার উপস্থিতি কেমন—এসব বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখার ঘাটতি রয়েছে।
৩. ডিজিটাল আসক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার:
বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মাঝে স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং ফেসবুক, টিকটক কিংবা অনলাইন গেমের প্রতি তীব্র আসক্তি তৈরি হয়েছে। পড়াশোনার মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে এসব ভার্চুয়াল বিনোদনে।
৪. কোচিং ও প্রাইভেট মুখী মানসিকতা:
বিদ্যালয়ের নিয়মিত ক্লাসের চেয়ে কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট পড়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শিক্ষার্থীদের স্বনির্ভর ও মননশীল হতে বাধা দিচ্ছে। অনেক সময় স্কুল ফাঁকি দিয়ে কোচিংয়ে সময় দেওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়।
৫. নিয়মিত মনিটরিং ও জবাবদিহিতার ঘাটতি:
শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির নিয়মিত মূল্যায়ন, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা এবং শিক্ষকদের পাঠদান কৌশলে আধুনিকতার কিছু ঘাটতি ফলাফলকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।
ফলাফল বিপর্যয় থেকে উত্তরণের কার্যকর উপায়
এই সংকট কাটিয়ে জকিগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়কে তার হারানো গৌরব ও ঐতিহ্যে ফিরিয়ে আনতে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। নিচে উত্তরণের কিছু সুনির্দিষ্ট উপায় তুলে ধরা হলো:
শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ ও আধুনিক প্রশিক্ষণ: যত দ্রুত সম্ভব শূন্য পদগুলোতে যোগ্য ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের আধুনিক ও সৃজনশীল পাঠদান পদ্ধতির ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
স্কুল-অভিভাবক নিবিড় যোগাযোগ: প্রতিমাসে অন্তত একবার অভিভাবক-শিক্ষক সভা (PTM) বা মতবিনিময় সভার আয়োজন করতে হবে। সন্তানের পরীক্ষার ফলাফল ও আচরণ সম্পর্কে অভিভাবকরা যেন নিয়মিত আপডেট পান, তার ব্যবস্থা করতে হবে।
মোবাইল ও ডিভাইস ব্যবহারে কঠোরতা: শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ও ক্যাম্পাসে মোবাইল ফোন আনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। ঘরেও সন্তানদের ডিভাইস ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।
দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য ‘রিমেডিয়াল ক্লাস‘: যেসব শিক্ষার্থী গণিত, ইংরেজি বা বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোতে দুর্বল, তাদের জন্য স্কুল চলাকালীন বা ছুটির পর বিশেষ অতিরিক্ত ক্লাসের (Remedial Classes) ব্যবস্থা করতে হবে।
সহশিক্ষা কার্যক্রম ও কাউন্সেলিং: লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও অনুপ্রেরণা জোগাতে নিয়মিত প্রীতি বিতর্ক, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কেরিয়ার কাউন্সেলিং সেশনের আয়োজন করা প্রয়োজন।
কঠোর মনিটরিং সেল গঠন: বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে, যারা নিয়মিত ক্লাসের উপস্থিতি, সিলেবাস শেষ হওয়ার গতি এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান তদারকি করবে।
Leave a Reply